ডেভেলপার বনাম কন্ট্রাক্টর: আমাদের জমি ও আমাদের টাকার নিয়ন্ত্রণ কার হাতে থাকা উচিত?
👉 আপনি আপনার জমির জন্য এক দশকেরও বেশি সময় অপেক্ষা করেছেন।
আরও একটু অপেক্ষা করা — নিয়ন্ত্রণ ও সুরক্ষার সঙ্গে — ঝুঁকিপূর্ণ চুক্তিতে
তাড়াহুড়ো করে ঢুকে পড়ার চেয়ে অনেক বেশি নিরাপদ।
জীবনে কোনো শর্টকাট নেই।
নিরাপদে পৌঁছাতে হলে সাবধানে হাঁটতে হয়।
শান্ত থাকুন। সচেতন থাকুন।
মূল প্রশ্ন: টাকা যদি আমরা দিই, তাহলে নিয়ন্ত্রণ আমরা হারাব কেন?
চলুন একটি সাধারণ ধারণা দিয়ে শুরু করি।
- ডেভেলপার মডেল-এ:
ডেভেলপার বলে সে “ইনভেস্ট” করবে, মালিকরা জমি দেয়, আর ডেভেলপার সবকিছু নিয়ন্ত্রণ করে। - কন্ট্রাক্টর মডেল-এ:
মালিকরা ধাপে ধাপে টাকা বিনিয়োগ করেন, আর কন্ট্রাক্টর কাজ করে মালিকদের নিয়ন্ত্রণে।
এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ সত্য রয়েছে, যা অনেক সময় ভুলভাবে বোঝা হয়:
👉 মি. রাজেশ মিশ্রার প্রস্তাবে “৫ কোটি টাকা বিনিয়োগ”-এর দাবি আসলে একটি
মিথ।
এই প্রস্তাব অনুযায়ী, প্লট হোল্ডারদেরকে ৯০ দিনের মধ্যে বড় অঙ্কের টাকা পরিশোধ
করতে বলা হচ্ছে। আমাদের কাছ থেকে এই টাকা সংগ্রহ করার পরেই ডেভেলপার কাজ শুরু
করার কথা বলছেন—আর সেই খরচকেই পরে নিজের “ইনভেস্টমেন্ট” হিসেবে তুলে ধরা হচ্ছে।
নিজেদের কাছে একটি সহজ প্রশ্ন করুন:
আমাদের কি কখনও বলা হয়েছে যে ডেভেলপার আগে প্রয়োজনীয় জমি কিনবেন, প্লট
ডিমার্কেশন করবেন, সবার মধ্যে প্লট বরাদ্দ করবেন, আর তারপর ৬ মাস বা ১ বছর পরে
আমাদের টাকা দিতে বলবেন?
উত্তরটি খুব স্পষ্ট—না।
বাস্তব চিত্রটি ঠিক উল্টো:
- আগে আমাদের টাকা দিতে বলা হচ্ছে
- সেই টাকাই ব্যবহার করে উন্নয়নের কাজ হবে
- আর তারপর বলা হবে, ডেভেলপার “বিনিয়োগ” করছেন
সহজ কথায় এর মানে দাঁড়ায়:
“তুমি টাকা দাও, আমি সেই টাকা খরচ করব, কিন্তু নিয়ন্ত্রণ থাকবে আমার হাতে।”
পরিচিত বাংলা প্রবাদে যেটা বলা হয়:
সবাই কই মাছের তেলে কই ভাজবে — মাছ ভাজা হচ্ছে মাছের নিজের তেলেই।
আসল ডেভেলপার ইনভেস্টমেন্ট কেমন হয় (একটি সহজ উদাহরণ)
ধরা যাক, শহরে আপনার ৫ কাঠা জমি আছে।
- একজন প্রকৃত ডেভেলপার আসে।
- সে নিজের টাকা দিয়ে একটি ফ্ল্যাট তৈরি করে।
- নির্মাণ শেষ না হওয়া পর্যন্ত আপনাকে ভাড়াবাড়িতে রাখে।
- কাজ শেষ হলে:
- আপনি ফ্ল্যাটের একটি অংশ পান।
- সে নিজের অংশ বিক্রি করে লাভ করে।
👉 আপনি এক টাকাও বিনিয়োগ করেন না।
👉 ডেভেলপার সব টাকা বিনিয়োগ করে।
এখন আমাদের পরিস্থিতির সঙ্গে তুলনা করুন:
- আমরা সবাই মিলে প্রায় ১২০ বিঘা জমির মালিক, যার মূল্য বহু কোটি টাকা।
- আমাদের বলা হচ্ছে:
- জমির নিয়ন্ত্রণ ছেড়ে দিতে
- ৯০ দিনের মধ্যে বড় অঙ্কের টাকা দিতে
- বাজেয়াপ্ত হওয়ার ঝুঁকি নিতে
তাহলে আসলে কে বিনিয়োগ করছে?
যদি টাকা আমরা দিই, তাহলে আমাদের ডেভেলপার দরকার নেই।
আমাদের দরকার একটি কন্ট্রাক্টর।
প্রস্তাবিত (রাজেশ মিশ্রার) ডেভেলপার চুক্তি কেন ঝুঁকিপূর্ণ
1. জমি NCLT সুরক্ষার বাইরে চলে যাওয়া
সহজ ভাষায় এর মানে কী:
চুক্তিতে চাওয়া হয়েছে:
- যৌথ উন্নয়ন চুক্তি (Joint Development Agreement)
- পাওয়ার অফ অ্যাটর্নি (PoA)
- ডেভেলপারের নামে জমি কেনা
এটা কেন গুরুত্বপূর্ণ:
একবার জমির নিয়ন্ত্রণ ব্যক্তিগত ডেভেলপারের হাতে গেলে:
- জমি কার্যত NCLT তত্ত্বাবধানের বাইরে চলে যায়
- আদালতের সুরক্ষা দুর্বল হয়
- পরে সমস্যা হলে উদ্ধার করা কঠিন হয়ে পড়ে
NCLT-এর উদ্দেশ্য হলো স্টেকহোল্ডারদের সুরক্ষা, এক পক্ষের হাতে নিয়ন্ত্রণ তুলে দেওয়া নয়।
2. এক হাতে অতিরিক্ত ক্ষমতা
এই চুক্তিতে ডেভেলপার পায় অধিকার:
- প্লট স্থানান্তর করার
- প্রকল্পের এলাকা বাড়ানোর
- বিদ্যমান প্লট হোল্ডারদের জন্য তৈরি অবকাঠামো ব্যবহার করার
- নতুন ক্রেতার কাছে প্লট বিক্রি করার
- সময়সূচি ও ক্রম নির্ধারণ করার
প্লট হোল্ডারদের জন্য এর অর্থ:
- মালিকরা দর্শকে পরিণত হন
- মনিটরিং কমিটির প্রকৃত নিয়ন্ত্রণ থাকে না
- প্রতিশ্রুতি শুধু বিশ্বাসের ওপর নির্ভর করে
নীরবে নিয়ন্ত্রণ সরে যায় প্রকৃত মালিকদের হাত থেকে।
3. বাজেয়াপ্ত হওয়ার ঝুঁকি: একবার দেরি মানেই সব শেষ
চুক্তিতে স্পষ্ট বলা আছে:
- ৯০ দিনের মধ্যে টাকা না দিলে
- প্লট কোনো রিফান্ড ছাড়াই বাজেয়াপ্ত
এতে প্রভাব পড়ে:
- অবসরপ্রাপ্তদের ওপর
- মধ্যবিত্ত পরিবারগুলোর ওপর
- বিদেশে থাকা প্লট হোল্ডারদের ওপর
একটি আর্থিক সমস্যা ১০–১৫ বছরের অপেক্ষা মুছে দিতে পারে।
এটা পুনরুদ্ধার নয়, শাস্তি।
4. কাগজে রিফান্ড ভালো, বাস্তবে দুর্বল
রিফান্ডের কথা বলা হলেও:
- তা পাওয়া যায় ২৪–৩৬ মাস পরে
- মোট রিফান্ডের সীমা নির্ধারিত
- ফার্স্ট কাম, ফার্স্ট সার্ভ ভিত্তিতে
- ৯০ দিনের পরে স্যারেন্ডারের সুযোগ নেই
অনেক প্লট হোল্ডার হয়তো বাস্তবে কোনো রিফান্ডই পাবেন না।
5. ক্রমবর্ধমান ও একাধিক পেমেন্ট
প্লট হোল্ডারদের দিতে হয়:
- প্রায় ₹৫৫,০০০ প্রতি কাঠা
- সঙ্গে ₹৫০,০০০ লাম্প সাম
- সঙ্গে ১৮% GST
- ভবিষ্যতে আরও এসক্যালেশন
টাকা দিতে হয় আগে, কিন্তু:
- এসক্রো-ধরনের সুরক্ষা নেই
- কাজের অগ্রগতির সঙ্গে কঠোরভাবে যুক্ত নয়
ঝুঁকি বেশি, নিয়ন্ত্রণ কম।
6. ন্যায্য সুরক্ষা ছাড়া বাতিল
পেমেন্টে দেরি হলে:
- প্লট বাতিল
- আগের টাকা কার্যত হারিয়ে যায়
- শেয়ারও বাজেয়াপ্ত হতে পারে
ঝুঁকি একতরফা। সব বোঝা মালিকদের কাঁধে।
7. সব অতিরিক্ত খরচ প্লট হোল্ডারদের ঘাড়ে
রেজিস্ট্রেশনের পর প্লট হোল্ডারদের দিতে হয়:
- জমি কনভার্সন ও মিউটেশন
- বাউন্ডারি ওয়াল
- যৌথ সীমানার সুরক্ষা
ডেভেলপার প্রকল্প নিয়ন্ত্রণ করে, কিন্তু দায়িত্ব এড়িয়ে যায়।
8. ডেভেলপার ব্যর্থ হলে কোনো পরিষ্কার প্রস্থান নেই
যদি:
- ডেভেলপার দেরি করে
- ডেভেলপার ব্যর্থ হয়
- ডেভেলপার আর্থিক সমস্যায় পড়ে
তখন:
- জমির নিয়ন্ত্রণ নেই
- NCLT সুরক্ষা দুর্বল
- প্লট হোল্ডাররা আটকে যান
কেন কন্ট্রাক্টর (অরুণ কেডিয়া) মডেল বেশি যুক্তিসংগত
কন্ট্রাক্টর মডেল-এ:
- জমি থাকে BBCL / প্লট হোল্ডারদের হাতেই
- NCLT সুরক্ষা বজায় থাকে
- টাকা তোলা হয় ধাপে ধাপে
- কন্ট্রাক্টর কাজ শেষ হলে তবেই পেমেন্ট পায়
- জমির ওপর কোনো PoA নেই
- মালিকানা বাজেয়াপ্ত হয় না
কন্ট্রাক্টর:
- রাস্তা, ড্রেনেজ, ইউটিলিটি তৈরি করে
- কাজের বিনিময়ে টাকা পায়
- জমির মালিকানা, বিক্রি বা নিয়ন্ত্রণ করে না
এটাই সহজ, বাস্তবসম্মত ও নিরাপদ।
“কোনো বিকল্প নেই” — এই ভয়ের কথা
কিছু মানুষ জিজ্ঞেস করেন:
“এই ডেভেলপার না হলে আর কী?”
এই ভয় প্রায়ই প্রশ্ন চাপা দিতে ব্যবহার হয়।
এক সময় মানুষ ভাবত, শচীন তেন্ডুলকার ছাড়া ভারত জিততে পারবে না।
আজও ভারত জিতছে।
কেউই অপরিহার্য নয়।
নিয়ন্ত্রণ হাতে রাখলে এবং শান্তভাবে ভাবলে সবসময় বিকল্প থাকে।
কন্ট্রাক্টর (অরুণ কেডিয়া) মডেলে ভয় ও চাপের জবাব
- আমরা আপনার জমি বাজেয়াপ্ত করব না
- ৯০ দিনের মধ্যে বড় অঙ্কের টাকা দিতে বাধ্য করব না
- পেমেন্ট হবে ধাপে ধাপে ও সাধ্যের মধ্যে
- রেজিস্টার্ড বা নন-রেজিস্টার্ড, পুরো টাকা দেওয়া বা আংশিক — কেউ বাদ পড়বে না
- আর্থিক অসুবিধার কারণে কেউ এখন বিনিয়োগ করতে না পারলে, শাস্তি নয়, সমাধান খোঁজা হবে
যদি কোনো ডেভেলপার (রাজেশ মিশ্রা) বলেন:
“আপনি শর্ত দিলে আমি চলে যাব।”
তাহলে উত্তর খুব সহজ:
আপনার আগ্রহের জন্য ধন্যবাদ। আমাদের আরও ভালো বিকল্প আছে।
প্লট হোল্ডারদের জন্য শেষ কথা
আপনি আপনার জমির জন্য এক দশকেরও বেশি সময় অপেক্ষা করেছেন।
আরও একটু অপেক্ষা করা — নিয়ন্ত্রণ ও সুরক্ষার সঙ্গে — ঝুঁকিপূর্ণ চুক্তিতে
তাড়াহুড়ো করে ঢুকে পড়ার চেয়ে অনেক বেশি নিরাপদ।
জীবনে কোনো শর্টকাট নেই।
নিরাপদে পৌঁছাতে হলে সাবধানে হাঁটতে হয়।
শান্ত থাকুন। সচেতন থাকুন।
সচেতনতাই আমাদের সবচেয়ে বড় সুরক্ষা।